বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৪:৫৭ অপরাহ্ন১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

নোটিশঃ
ওয়েবসাইটে আপনাকে স্বাগতম। নাগরিক আইটি থেকে কম মূল্যে ওয়েবসাইট বানাতে আজই যোগাযোগ করুন। কল করুন- ০১৫২১ ৪৩৮৬০১
সংবাদ শিরোনাম :
বামিংহামে করোনা দূর্যোগে খাবার বিতরণ করেন আলহাজ্ব কবির উদ্দিন ও ওয়াছিমুজ্জামান ছাতকে মধ্যরাতে জায়গা দখল করে ঘর নির্মাণ-গ্রেপ্তার ১ সুনামগঞ্জে সহকারী শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে হারিছ উদ্দিনের স্বরণ সভা অনুষ্ঠিত সুনামগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যদিয়ে মৎস্যজীবি লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন আন্দোলন ফোরামের সংবাদ সম্মেলন স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য সহকারীরা বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবীতে কর্মবিরতি পালন নাজমুল হকের অকাল মৃত্যুতে নারী নেত্রী ফেরদৌস আরা পাখি”র শোক ও সমবেদনা দিরাই উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে মত বিনিময় করেন ডক্টর সামছুল হক চৌধুরী মাদ্রাসা উন্নয়নে নগদ অর্থ প্রদান করেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী আবু বক্কর খাঁন সার্চ মানবাধিকার সংগঠনের উদ্যোগে ড. সামছুল হক চৌধুরী ও আবু বক্কর খাঁনকে সংবর্ধনা প্রদান
বর্ষিয়ান রাজনীতিবীদ ও সংসদ কবি সুরঞ্জিতের মৃত্যু বার্ষিকী আজ

বর্ষিয়ান রাজনীতিবীদ ও সংসদ কবি সুরঞ্জিতের মৃত্যু বার্ষিকী আজ

২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। লোকে লোকারণ্য সারা দিরাই। উদ্দেশ্য দাদা বাবুকে দেখা। এবার আর, হাসিমাখা মুখে নয়, খাটের ওপর লাশ হয়ে শুয়ে আছেন পশ্চিম এশিয়ার বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত।

এলাকায় গেলে” সেন দা, দাদাবাবু” এসেছেন বলে লোকদের মধ্যে হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়ে যেত। দলমত নির্বিশেষে প্রিয় নেতাকে দেখার জন্য তার আনোয়ারপুরের বাসভবনে ভীড় জমাতো ভাটির মানুষেরা। বর্ণনা করছিলাম, দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কথা।

জাতীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী হলেও সুরঞ্জিত খুবই কর্মীবান্ধব একজন নেতা ছিলেন। গ্রামের একটা সাধারণ কর্মীর কথাগুলোও মন দিয়েই শুনে যেতেন তিনি। সাধারনের মতোই ভাটির মানুষের সাথে মিশে যেতেন। দিরাই শাল্লা নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলে যেতেন। কখনও বা হাসিয়ে দিতেন পুরো সমাবেশের মানুষদের।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে তার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই ভাটির মানুষের হৃদয় মণিতে নিয়ে গিয়েছিল। দিরাই -শাল্লার মানুষ বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদকে দাদা কিংবা দাদাবাবু বলে সম্বোধন করতেন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৪৫ সালের ৫ মে, জল-জোস্নার শহর সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানার পৌরশহরস্থ আনোয়ারপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অসাধারণ পাণ্ডিত্য আর বিচক্ষণতার স্বরূপ তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ।

তার পিতার নাম দেবেন্দ্র নাথ সেনগুপ্ত এবং মাতা সুমতিবালা সেনগুপ্ত৷ দেবেন্দ্রনাথ ঢাকার বিক্রমপুর থেকে এসে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

স্থানীয় স্কুল থেকে প্রাথমিক সমাপ্ত করা সুরঞ্জিত, রাজানগর উচ্চ বিদ্যালয়, দিরাই উচ্চবিদ্যালয় ও সিলেটের এমসি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেন।

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড থেকে ১৯৬৫ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে সুরঞ্জিত সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এবং পরে আইন পেশায় নিযুক্ত হন। সেই সাথে গুণী এই ব্যক্তি বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন৷

রাজনীতি ছাড়াও আরো অনেক গুণেই নিজেকে রাঙ্গিয়ে নিয়েছিলেন সুরঞ্জিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা অবস্থায়
নাট্য-অভিনেতা হিসেবেও খ্যাতি ছিল মি. সেনগুপ্তের।

ঐসময় “হলগুলোর নাটকের প্রতিযোগিতায় অনেক শ্রেষ্ঠ নাটকেই সুরঞ্জিত অভিনয় করেছিলেন একাধিকবার। তখন তার বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলতেন, “অভিনেতা থেকে নেতা হয়ে গেছো “।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় সবসময়ই বড় ভূমিকা রেখে যাওয়া সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছাত্র জীবনেই বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। হাওরাঞ্চলের ‘জাল যার জলা তার’ আন্দোলনে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ক্ষণজন্মা এই পুরুষ । নিজ মেধা আর চমৎকার বাচন ভঙ্গির কারণে অল্পদিনেই তিনি সকলের নজরে চলে আসেন। শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করার ধরুন ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন সাহসী একজন ছাত্র নেতা।

যেকারণে পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে আসতেও তাকে তেমন বেগ পেতে হয় নি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে জীবনের পেশা শুরু করা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সংসদ সদস্য হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার ইতিহাসটাও যেন রুপ কথার গল্পের মতোই।

বর্ষীয়ান এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তার বর্ণাঢ্য দীর্ঘ ৫৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ৮ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরমধ্যে শুধুমাত্র সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) থেকে ৭ বার ও হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) থেকে ১ বার সংসদ সদস্য হন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বাংলাদেশের প্রথম খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধন কমিটির কো-চেয়ারম্যানও ছিলেন।

এর আগে সত্তরের নির্বাচনেও তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত সুরঞ্জিত ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের নির্বাচনেও ন্যাপ থেকে জয়ী হয়ে সারাদেশে আলোচনার জন্ম দেন।

সংসদে সব সময় সরব এ সংসদ সদস্য একজন অভিজ্ঞ সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

নিজের রাজনৈতিক কৌশল আর যোগ্যতার পরিচয় দেওয়ার ধরুন প্রখ্যাত এই পলিটিশিয়ানকে টানা ৭ বার সংসদ হিসেবে মনোনীত করে ইতিহাসের অনন্য নজির স্থাপন করে ভাটির মানুষ।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রীর ড. জয়া সেন, দিরাই- শাল্লার বর্তমান সংসদ সদস্য । তার একমাত্র পুত্র সৌমেন সেনগুপ্ত একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার,ও পুত্রবধূ রাখী মৈত্রী ভৌমিক পেশায় চিকিৎসক। সুরঞ্জিতের এক নাতি ও একজন নাতনী রয়েছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানীতে যার রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় সর্বত্রই পরিচিতি পেয়েছিলেন বর্ষীয়ান একজন রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নিজে একতা পার্টি নামক একটি দলও গঠন করেন। এবং দীর্ঘদিন এর নেতৃত্ব দেন।
আইনি দক্ষতা ও বিচক্ষণ রাজনৈতিক জ্ঞান সমৃদ্ধ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রথম জীবনে বামপন্থী রাজনীতিতে নাম লেখালেও, পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে, দলটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদসহ উপদেষ্টা পরিষদের দায়িত্ব পালন করেন

মাত্র ২৬ বছর বয়সেই সংসদ সদস্য হয়ে সবাইকে চমকে দেওয়া সুরঞ্জিত, সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিলেরও সদস্য ছিলেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাগ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দল ক্ষমতায় এলে রেল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে খ্যাতিমান এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

যদিও সহকারীর অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনার পর তিনি পদত্যাগ করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে চক্রান্তের স্বীকার সুরঞ্জিতকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিপরিষদে অধিষ্ঠিত করেন।

একসময় অনেকেই তার বক্তব্যকে ঠাট্টা বিদ্রুপ করলেও পরবর্তীতে এই মানুষটার কথার শুনার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতো ভাটির জনগণ।

এবিষয়ে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের একসময়ের সাথী মাস্টার আব্দুর রহমানের সাথে তার রাজনৈতিক জীবনাচরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুরঞ্জিত সেন ছিলেন জ্ঞ্যানের এক মহা সমুদ্র। প্রায় সব বিষয়েই তিনি ধারণা রাখতেন বলে তার কথাবার্তার স্টাইলও ছিল অন্যদের থেকে একটু আলাদা। যেকারণে প্রথমদিকে তিনি যখন কথা বলতেন, তখন তার বক্তব্য শুনে মানুষ হাসাহাসি করতো। সুরঞ্জিতের কথা শুনতে কেউই আগ্রহ দেখাতো না। মাস্টার রহমান বলেন, অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি যে, যে বক্তব্যের জন্য তাকে মানুষ বিদ্রুপ করতো, পরবর্তীতে সেই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বক্তব্য শুনার জন্য সমাবেশে জায়গা না মানুষ গাছের উপর উঠতেও ভয় করতো না।

যে কয়েকটি ব্যতিক্রমী গুণের জন্য সুনামগঞ্জ তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এক কালজয়ী মহাপুরুষ হয়ে উঠেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে তার যুক্তিনিষ্ঠ বক্তব্যই ছিল প্রধান উপজীব্য। এসম্পর্কে সিলেট প্রেসক্লাব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সিরিয়র সাংবাদিক আল-আজাদ বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যখন পার্লামেন্টে বক্তৃতা করতেন, সকল সদস্য সেটা তন্ময় হয়ে শুনতেন।

বক্তব্যের ফাঁকে বিভিন্ন সময়ই প্রবাদ কিংবা কবিতার পংঙ্গপ্তি ব্যবহার করতেন তিনি। যেজন্য তাকে অনেকেই সংসদ কবি বলে সম্বোধন করতেন। অভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদ মানুষের মাঝে বেশি পরিচিত ছিলেন সংসদে তার চাতুর্যপূর্ণ এবং রসাত্মক বক্তব্যের জন্য। যেকারণে রাজনীতিবিদ হিসেবে বিপক্ষের নেতাদেরও সমীহ পেয়েছেন তিনি।

ষাটের দশকের উত্তাল রাজনীতি থেকে উঠে আসা বামপন্থি এই নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন।
একাত্তরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং ৫ নম্বর সেক্টরের সাব কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভূগলেও একসময় তার শরীরে বাসা বাঁধে ফুসফুসে ক্যান্সার।

২০১৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ফুসফুসের সমস্যার জন্য রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি সুরঞ্জিতের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় তাকে প্রথমে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নেয়া হয়। পরে ৭১ বছর বয়সী সুরঞ্জিতকে রাতেই লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। পরে ৫ ফেব্রুয়ারি রোববার রাত ৪টার দিকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে বাংলাদেশের সংবিধান কমিটির অন্যতম সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত চলে যান না ফেরার দেশে।

মানুষের দেহের মৃত্যু হয় কর্মের নয়, যেকারণে বলা হয় কৃতিমানের মৃত্যু নেই। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন তেমনই এক ক্ষণজন্মা মানুষ।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর নিজ এলাকা দিরাইয়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের উদ্যোগে র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

শেয়ার করুন
  • 26
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





themesba-zoom1715152249
©সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।
Developed By: Nagorik IT